প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫৬
অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ক্রয়ে আমাদের দেশে যে পরিমাণ উৎসাহ দেখা যায় ততোটাই অনাগ্রহ লক্ষ্য করা যায় নির্মিত অবকাঠামো ও ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির সদ্ব্যবহারের জায়গায়। কেনাকাটায় এতো আগ্রহের পিছনের কারণ কম—বেশি সকলের জানা। নতুন প্রকল্প এবং ক্রয়—নির্মাণ মানেই অঢেল টাকা খরচের ব্যাপার। সরকারি টাকা খরচ মানেই বিভিন্ন পকেটে কমিশনের ভাগ পৌঁছে যাওয়া, এমন অভিযোগ এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত ধারণা। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এসব ভবন নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করার পর মূল কাজ আর শুরু করা হয় না। কারণ এসব ভবন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে যে জনবল দরকার পড়ে সেখানে থাকে পরিষ্কার উদ্যেগহীনতা। যেকোনো প্রকল্প শুরু করার আগেই যেখানে জনবল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাথে সমান্তরালভাবে অগ্রসর হওয়ার কথা সেখানে জনবল নিয়োগের বিষয়টিই থাকে উপেক্ষিত। ফলে নির্মিত ভবন নষ্ট হয়, যন্ত্রপাতিতে জং ধরে; অব্যবহৃত থাকতে থাকতে পরিত্যক্ত আবর্জনায় পরিণত হয়। সরকারি কাজের এই সমন্বয়হীনতা ও দুর্দশাগ্রস্ত চেহারা বর্ণনার কারণ গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ। সমাজসেবা অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগরে জেলা শিশুসদনের পাশে একটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করে ২০২৪ সনে। কেনা হয় আসবাবপত্র, ব্যায়ামের সরঞ্জাম ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। ২৫ শয্যার ব্যবস্থা আছে এখানে। উদ্দেশ্য ছিলো সুবিধাবঞ্চিত বয়স্ক ব্যক্তিদের আশ্রয়নের নিশ্চয়তা বিধান। শিশুসদনের পাশে এই বৃদ্ধনিবাস স্থাপনের উদ্দেশ্যও মহৎ।
শিশুদের পাশাপাশি এই বয়স্করা শান্তিনিবাস নামক বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থান করে নিজেদের নিঃসঙ্গতা ভুলে আনন্দদায়ক জীবন উপভোগ করতে পারবেন। নিঃসন্দেহে অতিশয় মানবিক উদ্দেশ্য। যদি প্রকল্প—উদ্দেশ্য মোতাবেক এটি চালু করা সম্ভব হতো তাহলে শিশু ও বৃদ্ধ, জীবনের শুরু ও শেষের এই দুই জীবনের পাশাপাশি অবস্থান উভয়ের জন্য হিতকর হতো। শিশুরা যেমন বৃদ্ধদের স্নেহধন্য হতে পারতো তেমনি বৃদ্ধরাও শিশুদের কল—কাকলির মধ্যে নিজের দুঃখ ভুলে থাকার উপায় খোঁজে পেতেন। কিন্তু ভবন হয়েছে মূল্যবান সামগ্রী কেনা হয়েছে তারপরেও এখানে বৃদ্ধদের বসতি শুরু করা যায়নি। কারণ শান্তিনিবাসের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সৃজন হয়নি। অর্থাৎ জনবল সৃজন ছাড়াই ভবন ও সরঞ্জাম কেনার কাজ শেষ করে ফেলা হয়েছে। খরচ করা হয়ে গেছে সরকারের সাত কোটি টাকা। এখন শান্তিনিবাসের ভবনগুলো হয়েছে ইঁদুর ও আরশোলার আশ্রয়কেন্দ্র, খসে পড়ছে পলেস্তারা, দেয়ালে জন্মেছে শ্যাওলা। নষ্ট হচ্ছে বহু দামে কেনা আসবাব, ব্যায়াম ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। কবে জনবল সৃজন হয়ে এটি চালু করা সম্ভব সে বিষয়েও নেই কোনো স্পষ্ট কর্তৃপক্ষীয় আশ^াস। ‘বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে’ বলে দায় সারলেন জেলা সমাজসেবার উপপরিচালক। কেবল অবহেলা ও উদ্যোগহীনতার কারণে একটি মহৎ মানবিক প্রকল্প এখন নিজেই বার্ধক্যে পৌঁছার উপক্রম।
এই সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিদের এখন অনেক দুর্দশা। পারিবারিক বন্ধন এখন আগের চাইতে অনেক বেশি ক্ষয়িষ্ণু। সমাজের নিম্নস্তরের বহু বয়স্ক ব্যক্তি এখন আশ্রয়হীন অবস্থায় পথে—ঘাটে ঘুরে বেড়ান। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে প্রবীণ ব্যক্তিদের সমস্যা অন্য রকমের। তাঁদের হয়তো টাকা—পয়সার অভাব নেই। কিন্তু তাঁরা নিঃসীম নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। অসুস্থ হলে তাঁদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো লোক নেই। প্রতিষ্ঠিত সন্তান—সন্ততি জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করেন। এই সামর্থবান প্রবীণ ও অসমর্থ প্রবীণ; উভয়ের প্রতিই রাষ্ট্রের কিছু দায় আছে। কারণ এই উভয় শ্রেণির প্রবীণ ব্যক্তিরা তাঁদের কর্মক্ষম জীবনটি কোনো না কোনোভাবে শ্রম—মেধা দিয়ে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছিলেন। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ জীবনে একটু সহানুভূতি তাঁদের প্রাপ্য। রাষ্ট্র এই জায়গায় চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এ জন্যই শান্তিনিবাস ধরনের প্রকল্প তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের কমিশনভোগী কাঠামো তা হতে দেয় না। তাঁরা একটি প্রকল্পকে পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবহ করতে সকল উদ্যোগ একসাথে গ্রহণ করে না। ফলে ভবন হয়, সরঞ্জাম কেনা হয়; কিন্তু প্রত্যাশিত সেবা শুরু করা সম্ভব হয় না। এটি কেবল এই শান্তিনিবাসের ক্ষেত্রে নয় আরও বহু সরকারি প্রকল্পেই এমন বাস্তবতা বিদ্যমান। সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভবনের কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু জনবল সৃজন না হওয়ায় হাসপাতালের কাজ শুরু না করতে পারার ঘটনা সর্বসাম্প্রতিক আলোচিত একটি ইস্যু। এরকম আরও বহু আছে।
সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে হাছননগরের শান্তিনিবাসটি এই এলাকার কিছু প্রবীণের মুখে হাসি ফুটাক, এমনটি সকলের মনের কথা। মানুষের এই মনের কথা বুঝবার মানবিক সক্ষমতা কি আছে মান্যবর ‘উর্দ্ধতন’দের ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন